
থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবান :
বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার বলীপাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শতিশ চন্দ্র গ্রামের ছোট্ট একটি জুমচাষি পরিবার। প্রতিদিনের সংগ্রাম যেখানে দুবেলা খাবার জোগাড়ের, সেই পরিবারই এখন নিজের মেয়েকে বাঁচাতে মৃত্যু সঙ্গে লড়ঁছে এক কঠিন যুদ্ধ।
মাত্র ১৫ বছর বয়সী অজারুং ত্রিপুরা, অবয় বিনোদিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক মেধাবী শিক্ষার্থী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হওয়ায় পরিবারের সবার আদরের সন্তান সে। কিন্তু ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে অজারুং।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে জ্বরে আক্রান্ত হলে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। পরে দ্রুত তাকে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ১ নম্বর আইসিইউর ১ নম্বর শয্যায় লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন রয়েছে সে। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চললেও প্রতিটি মুহূর্ত পরিবারের জন্য অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠায় কাটছে।
অজারুংয়ের বাবা পূর্ণচন্দ্র ত্রিপুরা একজন অতি হতদরিদ্র জুমচাষি।
মেয়েকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মেয়েকে বাঁচাতে যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকার মানুষের সহায়তায় প্রায় চার লাখ টাকার বেশি ঋণ করেছি। এখন আর চিকিৎসার খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই। আমি শুধু চাই আমার মেয়েটা বেঁচে থাকুক। সরকারের সহযোগিতা আর সমাজের বিত্তবান মানুষের মানবিক সহায়তা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভরসা নেই।
বলীপাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পিটর ত্রিপুরা বলেন, অজারুং অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত-স্বভাবের ও ভদ্র ছাত্রী। এমন একটি দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এত ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা অসম্ভব। তিনি সরকার, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বলীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াঅং মারমা বলেন, দুর্গম এলাকার এই অসহায় পরিবারটি এখন চরম সংকটে রয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সাবেক ইউপি সদস্য লাপ্রাত ত্রিপুরা বলেন, স্থানীয়ভাবে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় পরিবারটি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এখন সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সুপারভাইজার আমীর হোসেন বলেন, বিষয়টি তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে জেনেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন।
একদিকে হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছে অজারুং, অন্যদিকে হাসপাতালের করিডোরে অসহায় হানাতি ত্রিপুরা মায়ের নির্ঘুম অপেক্ষা। প্রতিটি মুহূর্তে তারা শুধু একটি খবরের অপেক্ষায়, তাদের মেয়েটি সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসবে পাহাড়ের সবুজে ঘেরা নিজের ঘরে।
অজারুং ত্রিপুরার পরিবার সরকারের উচ্চপর্যায়, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতি মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। সময়মতো প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মিললে হয়তো একটি সম্ভাবনাময় কিশোরীর জীবন নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।
