
ডেক্স রিপোর্ট:
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো মৌলিক অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বঞ্চিত তালিকায় রয়েছে রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত জাতীয়করণকৃত এলিম সাংদালা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠদান কার্যক্রম সন্তোষজনক হলেও বিদ্যালয়টির জরাজীর্ণ ভবন, ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার (১৬ জুন) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান চলছে এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর একমাত্র সড়কটি অত্যন্ত নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল, কাদা,ভাঙাচোরা রাস্তা ও ক্ষতিগ্রস্ত কালভার্টের কারণে শিক্ষার্থী,শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ,বছরের পর বছর ধরে বিদ্যালয়টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“শিশুরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যায়। অথচ এই বিদ্যালয়টি সরকারি নানা কাজে ব্যবহৃত হলেও উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া পায়নি। একটি আধুনিক ও নিরাপদ বিদ্যালয় ভবন এবং চলাচল উপযোগী সড়ক নির্মাণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোমেসিং মারমা জানায়, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট পাহাড়ি পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। সে বলে, “আমরা আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করি। কিন্তু বর্ষাকালে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে বৃষ্টির পানি ঢুকে যায়। অনেক সময় ভিজে ভিজেই ক্লাস করতে হয়। নতুন ভবন হলে আমরা আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারব।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মংক্যচিং মারমা বলেন,বর্তমান ভবনটি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও প্রয়োজনের তুলনায় সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত। ভবনের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সড়ক উন্নয়ন করা হলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা পুহ্লামং মারমা (৪২) বলেন, “সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে শিক্ষকরা অনেক সময় বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। নতুন ভবন ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হলে পুরো এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এলাকার প্রবীণ কারবারি রেদামং মারমা (৭২) বলেন, “আমাদের পাড়ায় ২৬টি পরিবার বসবাস করে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে আমাদের সন্তানরা নিজ এলাকায় শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করছেন,কিন্তু ভাঙাচোরা ভবনের কারণে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত ভবন সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে রুমা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আশিষ চিরান জানান,বিদ্যালয়ের জন্য পাহাড়ি এলাকার উপযোগী বিশেষ নকশার একটি নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা বলেন,এলিম সাংদালা পাড়া একটি শান্ত ও সুন্দর পাহাড়ি এলাকা। বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যালয়গামী সড়কের উন্নয়ন প্রয়োজন।
স্থানীয় অভিভাবক,শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের অভিযোগ,দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যখন আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, তখন পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এখনো জরাজীর্ণ ভবন, অনিরাপদ শ্রেণিকক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের মধ্যেই শিক্ষা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এটি শুধু অবহেলার চিত্রই নয়,বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
তাদের দাবি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর,পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং স্থানীয় প্রশাসন অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিদ্যালয়ের জন্য আধুনিক ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং বিদ্যালয়গামী সড়কের উন্নয়ন নিশ্চিত করুক।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রতিকূল পরিবেশেও শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী,শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান করছেন,সেখানে একটি নিরাপদ বিদ্যালয় ভবন ও চলাচল উপযোগী সড়ক পেতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?
