রবিবার, আগস্ট ২, ২০২৬
Homeখাগড়াছড়িতিন পার্বত্য জেলার দুর্গম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট ও অনিয়মিত পাঠদান: কারণ...

তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট ও অনিয়মিত পাঠদান: কারণ কী, সমাধান কোথায়?

ডেস্ক রিপোর্ট :

বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠদান নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক বিদ্যালয়ে সপ্তাহের নির্ধারিত কর্মদিবসেও শিক্ষক উপস্থিত থাকেন না বা সীমিত সময় অবস্থান করে ফিরে যান। ফলে শত শত শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন এলাকার অভিভাবক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য, জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে বাস্তবতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র।

বান্দরবানের রুমা, থানচি, আলীকদম; রাঙামাটির বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল; এবং খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি, পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গার বেশ কয়েকটি দুর্গম বিদ্যালয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিত হন না। কিছুকিছু বিদ্যালয়ে একজন বা দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান পরিচালিত হচ্ছে। আবার কোথাও পদ শূন্য থাকায় একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ্যের অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন,আমাদের সন্তানরা প্রতিদিন স্কুলে যায়, কিন্তু অনেক দিন শিক্ষক না থাকায় আবার বাড়ি ফিরে আসে।

একজন স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য বলেন, শিক্ষকদের অনেকেই উপজেলা সদর বা জেলা শহরে থাকেন। পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করা কঠিন হওয়ায় নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। অনেক বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হাঁটতে হয়। কোথাও নৌকা, কোথাও ঝিরি, আবার কোথাও বর্ষাকালে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেজন্য প্রয়োজন স্থানীয় শিক্ষক নিয়োগ। স্থানীয় ভাষা ও পরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞ শিক্ষক তুলনামূলক কম নিয়োগ পাওয়ায় বাইরের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন দুর্গম এলাকায় থাকতে অনাগ্রহী হন। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে নিরাপদ শিক্ষক কোয়ার্টার নেই। ফলে শিক্ষকরা উপজেলা সদর থেকেই যাতায়াত করেন। দুর্গমতার কারণে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন সম্ভব হয় না বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

তারা আরো বলেন, দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা বা অতিরিক্ত সুবিধা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি শিক্ষকেরা। তাই শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব,শিখন ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে,বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা বাড়ছে,ঝরে পড়ার হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে ও শিক্ষার মান শহর ও পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য আরও বাড়ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল শিক্ষক নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পাহাড়ের বাস্তবতা বিবেচনায় একটি পৃথক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকার স্থানীয় যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ,প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক আবাসন নির্মাণ,দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা বৃদ্ধি,বায়োমেট্রিক বা জিপিএস-ভিত্তিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু,উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নৌযান ও পাহাড়ি মোটরসাইকেলসহ যাতায়াত সহায়তা প্রদান।

এই অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া হলে তারা জানান, দুর্গম এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষক স্বল্পতা, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু দুর্গমতার কারণে যদি নিয়মিত পাঠদানই নিশ্চিত না হয়, তাহলে শিক্ষা বৈষম্য আরও বাড়বে। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষক নীতি, কঠোর তদারকি এবং পাহাড়বান্ধব শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

সম্পর্কিত আর্টিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য

error: