বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
Homeবান্দরবানরুমায় হোস্টেল কর্তৃপক্ষ দায়িত্বে অবহেলায় এক শিক্ষার্থী নিখোঁজ

রুমায় হোস্টেল কর্তৃপক্ষ দায়িত্বে অবহেলায় এক শিক্ষার্থী নিখোঁজ

ডেক্স রিপোর্টঃ

বান্দরবানের রুমা উপজেলা সদরের থানা পাড়া এলাকায় অবস্থিত সেন্ট আন্তনী কাথলিক গির্জা পরিচালিত হোস্টেল থেকে সাঙ্গু নদীতে গোসল করতে গিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় হোস্টেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

নিখোঁজ শিক্ষার্থীর নাম পাইংরুং ম্রো (৯)। সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে এবং হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করছিল। তার বাবার নাম পকসিং ম্রো। বাড়ি টুংগী পাড়া এলাকায় বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত-৮ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে পাইংরুং ম্রোসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী সাঙ্গু নদীর ঘাটে গোসল করতে যায়। একপর্যায়ে পাইংরুং পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয়। ঘটনার পর থেকে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চললেও এখনো তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় হোস্টেলের শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

জানা গেছে,হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দেখাশোনার জন্য-৪ জন শিক্ষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে বিউটি চিরান,লাজারুজ ত্রিপুরা,রোজিনা ত্রিপুরা ও জ্যোতি ত্রিপুরা নাম জানা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি,এতজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে মাত্র নয় বছর বয়সী একজন শিশু শিক্ষার্থী হোস্টেল থেকে বের হয়ে সাঙ্গু নদীতে গোসল করতে গেল—এ প্রশ্নের জবাব অবশ্যই দিতে হবে।

হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ,তাদের নিয়মিত গোসলের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বাইরে গিয়ে নদীর ঘাটে গোসল করতে হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন,“আমাদের হোস্টেলে গোসল করতে দেওয়া হয় না। তাই বাইরে সাঙ্গু নদীর ঘাটে গিয়ে গোসল করতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের এক ইউপি সদস্য অভিযোগ করে বলেন,হোস্টেলে ছোট ছোট শিশু শিক্ষার্থীরা অবস্থান করলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো যথাযথ ব্যবস্থা নেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা যদি নিয়মিত ও যথাযথভাবে শিশুদের দেখভাল করতেন,তাহলে এত অল্প বয়সী একজন শিক্ষার্থী কীভাবে হোস্টেল থেকে নদীর ঘাটে পৌঁছাল—তা তদন্তের দাবি রাখে।

তাদের প্রশ্ন,হোস্টেলের ভেতরে শিশুদের নিরাপদে গোসলের ব্যবস্থা না থাকলে এবং নদীতে গোসল করতে গেলে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকলে,শিশুদের আবাসিক হোস্টেল পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হলো কীভাবে?

স্থানীয়দের অভিযোগ,দায়িত্বশীল পর্যায়ের একজন ব্যক্তি বিষয়টি যথাযথভাবে না জানিয়েই প্রায় এক মাসের জন্য চলে যাওয়ায় হোস্টেলের ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

হোস্টেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জন ত্রিপুরা বলেন,ইনচার্জ না থাকায় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দেখাশোনা করে থাকেন। তিনি জানান,দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন স্কুলের শিক্ষক।

অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,ঘটনার দিন সকালে পাইংরুংয়ের মা-বাবা বান্দরবান যাওয়ার সময় তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরে বিকেলে সন্তানের পানিতে ডুবে নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে তারা মর্মাহত হয়ে পড়েন।

স্থানীয়দের অভিযোগ,ঘটনাটি নিছক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের দায়িত্বে অবহেলা,পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব কিংবা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ছিল কি না—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে,হোস্টেলে থাকা শিশুদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা,গোসলের স্থান,পর্যাপ্ত তদারকি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারব্যবস্থা কেন নিশ্চিত করা হয়নি।

বলি পাড়া মিশন হোস্টলের ফাদার সিটল বলেন, “আমাদের এই হোস্টেলের ইনচার্জ হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি গত মাস থেকে কর্তৃপক্ষকে কোনো ধরনের অবহিত না করে নিজের ইচ্ছামতো দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। এ ঘটনায় আমরা সবাই মানসিকভাবে খারাপ অবস্থায় আছি।

তিনি আরও বলেন,“হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কিছুটা অবহেলা রয়েছে বলে আমরা মনে করছি। বিশেষ করে এখানে থাকা ছোট ছোট শিশুদের নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক তদারকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিচালনা ও নিয়মিত তদারকি করা হলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হয়তো ঘটত না।

ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে প্রশাসন,সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও হোস্টেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশু পাইংরুং ম্রোকে দ্রুত উদ্ধার এবং ভবিষ্যতে আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

শিশুদের নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্বে অবহেলার কোনো অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং হোস্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জরুরি সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।

সম্পর্কিত আর্টিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য

error: