শনিবার, মে ৩০, ২০২৬
Homeপার্বত্য রাজনীতিবান্দরবানে বিএনপির রাজনৈতিক সংকট: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

বান্দরবানে বিএনপির রাজনৈতিক সংকট: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

মতামত:

বান্দরবানের রাজনীতি বরাবরই বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে কিছুটা ভিন্ন। এখানে কেবল দলীয় প্রতীক নয়, ব্যক্তি প্রভাব, পারিবারিক ঐতিহ্য, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং পাহাড়ি সমাজ কাঠামো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, জেলার একটি বড় অংশের জনগণের রাজনৈতিক ঝোঁক ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি বেশি। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

বর্তমানে বান্দরবান জেলা বিএনপিতে দুটি শক্তিশালী বলয় সক্রিয়। একটি বলয়ের নেতৃত্বে আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী, অন্য বলয়ের নেতৃত্বে আছেন সাবেক মহিলা এমপি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিসেস ম্যাম্যাচিং। দীর্ঘদিন ধরে এ দুই পক্ষের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে তুলেছে। দল যখনই একজনকে সামনে নিয়ে আসে, অন্যপক্ষ ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে কিংবা নিজস্ব কৌশলে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে। ফলে ভোট বিভক্ত হয় এবং রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয় অন্য পক্ষ। এ বাস্তবতা এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ নয়, সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝেও এটি স্পষ্টভাবে আলোচিত বিষয়।

বর্তমানে জেলা বিএনপির এই দুই নেতারই বয়স সত্তরের ঘরে। মিসেস ম্যাম্যাচিং শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ। কিডনি জটিলতার কারণে তাঁকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিতে হয়। এমনকি সাম্প্রতিক নির্বাচনেও তিনি সরাসরি অংশ নিতে পারেননি। অন্যদিকে সাচিংপ্রু জেরীর নেতৃত্বাধীন বলয়ের মধ্যেও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদকে ঘিরে পারিবারিক প্রভাব বিস্তারের আলোচনা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই সাশৈপ্রু ব্রিগেডিয়ারকে চেয়ারম্যান করার আগ্রহ স্থানীয় জনগণের একটি অংশের ইতিবাচক সাড়া সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং সাধারণ মানুষদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আমার মতে, শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়, এটি রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ও আচরণগত কিছু বিষয় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, বান্দরবানের বিএনপি এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গেও লড়াই করছে। তাই দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করা, যিনি দুই পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে পারবেন এবং সাংগঠনিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।

এ অবস্থায় বান্দরবানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ মানুষের প্রয়োজন। মানুষ মূলত সংঘাত নয়, স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব খুঁজছে। এমন একজন ব্যক্তি, যিনি পাহাড়ের সামাজিক বাস্তবতা বোঝেন, প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনার অভিজ্ঞতা রাখেন এবং ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দলীয় ঐক্য ও জেলার সার্বিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।

সেক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত মেজর ওয়াং টিংয়ের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় আসছে। বান্দরবানের একজন গর্বিত কৃতি সন্তান। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সততা, দক্ষতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে মেজর পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর কর্মজীবন নেতৃত্ব, সামাজিক, রাজনৈতিক অঙ্গনে, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দেশপ্রেমের একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে পরিচিত।

আমার মতে, জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি মেজর ওয়াং টিংয়ের মতো অভিজ্ঞ, সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করবে না, একইসাথে বিএনপির দুই বলয়ের মাঝেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সহায়ক হতে পারে। কারণ তিনি সরাসরি কোনো পক্ষীয় কোন্দলের সঙ্গে জড়িত নন এবং উভয় পক্ষের কাছেই তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত।

রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, বিএনপি যদি আবারও বিভক্ত অবস্থায় এগোয়, তাহলে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে প্রতিপক্ষই। কিন্তু যদি এমন একজন গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সামনে আনা যায়, যিনি সাচিংপ্রু জেরীর গ্রুপ ও ম্যাম্যাচিং পন্থী নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে পারেন। তাহলে দলটি নতুন করে সাংগঠনিক শক্তি ফিরে পেতে পারে। একইসাথে জেলা পরিষদও পেতে পারে একটি দক্ষ, অভিজ্ঞ ও জনমুখী নেতৃত্ব।

সবশেষে বলা যায়, বান্দরবানের মানুষ এখন সংঘাতের রাজনীতি নয়, সমন্বয় ও উন্নয়নের রাজনীতি দেখতে চায়। পাহাড়ের বাস্তবতা বুঝে সকল পক্ষকে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই কেবল একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে মনে করি।

চাই এ মং মার্মা (কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়)
Raisingbd.com জেলা প্রতিনিধি, বান্দরবান।

 

সম্পর্কিত আর্টিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য

error: