
সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ, আলীকদম:
বান্দরবানের আলীকদমের নয়াপাড়া ইউনিয়নের মংচাপাড়ার এলাকার অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম আমার। বুঝতে শেখার পর থেকে দেখছি,অভাবের অক্টোপাস আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে আমাদের। মা-বাবার কাছে কোনো বায়না ধরলেই অভাব আর অভাবের গল্প শুনতে হতো। না শুনেই বা উপায় কী? মা-বাবা দুজনই দিনমজুর।
তিন বেলা পেটপুরে ভাত খাওয়াটাই তো বিলাসিতার মতো। সমবয়সীদের জন্য অনেক আনন্দের উপলক্ষ নিয়ে হাজির হয় সাংগ্রাই। উল্টো আমার মনটা কেমন খারাপ হয়ে যেত। সবার জামা রঙিন, আমারটা মলিন! পাড়ায় আমরা ছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের সেই উক্তির মতো, ‘গরীবের মধ্যে সে গরীব, ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক।
এ কারণে অনেকে বাঁকা চোখে তাকাত। কারো কারো কথায় মনে হতো—আমরা বুঝি ঊন-মানুষ!
বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ছিল স্কুল। আলীকদম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আসা-যাওয়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হতো।
বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে আলীকদম আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়। হোস্টেল সুবিধা আছে বিধায় চতুর্থ শ্রেণির পর সেখানে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। প্রথম দিকে হোস্টেলে নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়েছিল। এই প্রথম মা-বাবার কাছ থেকে দূরে। ঝড়ের সময় লোডশেডিং হতো।
মোমবাতি ছিল ভরসা। তবে গভীর রাতে লোডশেডিং হলে ভয় লাগত খুব। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন খবর পেলাম, জঙ্গলে গাছ কাটতে গিয়ে বাবা হাতে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। অপারেশন করাতে হয়েছিল। আমাদের তো দিন আনি দিন খাই অবস্থা। সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না। ফলে হাত পাততে হয়েছিল প্রতিবেশীদের কাছে। ঘরে অসুস্থ বাবা। তখন তিন বেলা খাবার জোগানই মুশকিল হয়ে পড়ল।
তত দিনে বুঝলাম, পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় নেই। জিপিএ ৪.৩৩ পেয়ে এসএসসি পাস করলাম। শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। খুব ইচ্ছা ছিল চট্টগ্রাম শহরের ভালো কলেজে পড়ব, কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতায় তা হলো না। মা-বাবার পরামর্শ মেনে কাছাকাছি কোনো কলেজে পড়ার চিন্তা করলাম। আমার কাছে দুটি বিকল্প ছিল—আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মাতামুহুরী সরকারি ডিগ্রি কলেজ। দ্বিতীয়টিতে যাওয়া-আসার খরচ বেশি। অন্যদিকে প্রথমটি মিনিট ত্রিশেক হাঁটার পথ। কিন্তু সেখানে যেতে মাতামুহুরী নদী পার হতে হতো। বর্ষাকালে কষ্ট হতো বেশি। খরস্রোতা নদী। ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হতো। তবু ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ বেছে নিলাম। ভর্তি ফি ১০ হাজার টাকা। এটি জোগাড় করা রীতিমতো অসম্ভব বাবার জন্য। তাই কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করলাম যেন দুই কিস্তিতে ভর্তির ফি পরিশোধের সুযোগ দেয়।
দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা। এবারও ঋণ নিয়ে কিডনির অপারেশন করাতে হলো। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে তখন একমাত্র ছোট ভাইটিও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ল! একদিকে অভাব, অন্যদিকে এত দুর্যোগ—ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিলাম। এক পর্যায়ে ভাবলাম, পড়াশোনা ছেড়ে কোনো কাজে লেগে পড়ি। বুঝতে পেরে সাহস জোগালেন কলেজের কিছু শিক্ষক। তাঁদের উৎসাহ আর নিজের পরিশ্রমের ফল পেলাম—এইচএসসিতে জিপিএ ৫। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন বুনলাম। কিন্তু এখানেও বাধা সেই অর্থ। কোচিংয়ে ভর্তির টাকা পাই কই? পরে কলেজের রাজু বড়ুয়া ও শামীম হোসেন স্যার এগিয়ে এলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। সুযোগ পেলাম পাঁচটিতে। জাহাঙ্গীরনগরে ‘ই’ ইউনিটে ২৬৫তম, রাজশাহীতে ‘খ’ ইউনিটে ৫৫তম, জগন্নাথে ‘গ’ ইউনিটে ১০২৪তম, চট্টগ্রামে ‘ঘ’ ইউনিটে ৫০১তম এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিটে দ্বিতীয়, ‘গ’ ইউনিটে তৃতীয় হলাম। এখনো ভর্তির দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। তবে চিন্তায় আছি ভর্তি ফি জোগাড় করা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা কিভাবে চালাব, সেটিও আরেক চিন্তার বিষয়। মা এখনো দিনমজুরি দেন, বাবা অটো চালানো শুরু করেছেন। এই পর্যন্ত আসতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। জীবনে যদি প্রতিষ্ঠিত হতে পারি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াব।
